মূলত নিজেদের অর্থনীতি সচল রাখতে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকছে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত জ্বালানি তেল সরবরাহ পথগুলো মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ায় এ বড় পরিবর্তন হয়েছে বলে সরকারি বাণিজ্য ও শিপিং পরিসংখ্যানে দেখা গেছে। খবর নিক্কেই এশিয়া।
গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে। এতে করে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যেসব দেশ জ্বালানি তেলের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল, তারা তীব্র সংকটে পড়ে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশগুলো বাধ্য হয়ে নতুন উৎসের সন্ধান শুরু করে।
ইউরোপীয় বাণিজ্য গবেষণা সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির তুলনায় এপ্রিলে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে থাইল্যান্ডের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ৫০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। এ বিশাল ঘাটতি পূরণ করতে ব্রুনাই থেকে দৈনিক ৭১ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করেছে থাইল্যান্ড, যা ২০১৮ সালের পর সর্বোচ্চ। পাশাপাশি দেশটি লিবিয়া থেকে আমদানি ২৮ শতাংশ বাড়িয়েছে এবং আর্জেন্টিনা ও গায়ানার মতো নতুন বাজার থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহ শুরু করেছে। থাইল্যান্ডের সরকারি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, তারা ব্রাজিল, নাইজেরিয়া ও কাজাখস্তানসহ বেশ কয়েকটি দেশ থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির চেষ্টা করছেন।
আসিয়ান দেশগুলোর মধ্যে এ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভিয়েতনাম। দেশটির মোট আমদানীকৃত অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ৮০ শতাংশই আসত কুয়েত থেকে। কিন্তু সংকটের কারণে কুয়েতের তেল রফতানি স্থবির হয়ে পড়ায় ভিয়েতনামের আমদানি ব্যাপক হারে কমে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ভিয়েতনাম এখন অ্যাঙ্গোলা, আইভরি কোস্ট ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করছে। ভিয়েতনামের একটি প্রধান শোধনাগার জানিয়েছে, জাপানি মূল প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় তারা মে মাসের শেষ পর্যন্ত কারখানা চালু রাখার মতো বিকল্প জ্বালানি তেলের ব্যবস্থা করতে পেরেছে।
অন্যদিকে বিশ্বের শীর্ষ জাহাজের জ্বালানি সরবরাহ কেন্দ্র সিঙ্গাপুরেও এপ্রিলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি তেল আমদানি প্রায় ৬১ শতাংশ কমেছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সিঙ্গাপুর দ্রুত তাদের আমদানির উৎস পরিবর্তন করে এবং বর্তমানে দেশটির ৬০ শতাংশেরও বেশি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আসছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এ সুযোগে ব্রুনাই আসিয়ান অঞ্চলের একটি প্রধান তেল রফতানিকারক দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেশটির তেল রফতানি গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এশিয়ার শোধনাগারগুলো দ্রুত বিকল্প হিসেবে রাশিয়ার জ্বালানি তেলের দিকেও নজর দিচ্ছে, তবে সীমিত পরিমাণের কারণে এটি পুরো সংকট সমাধান করতে পারবে না।
জ্বালানি খাতের এ বড় চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতিতে গত মার্চে রফতানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ইলেকট্রনিকস খাতের বৈশ্বিক চাহিদার ওপর ভর করে এ অর্থনৈতিক সক্ষমতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, প্রযুক্তি খাতে যুক্ত থাকায় সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো বাণিজ্যিক ও জ্বালানির ধাক্কা ভালোভাবে সামলে উঠছে। তবে যেসব দেশ প্রযুক্তির বাজারে পিছিয়ে রয়েছে তাদের জন্য সামনের দিনগুলো বেশ চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।